তখন আমরা ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেনে পড়ি। রনি, সাগর, শরিফ, সরফু আর আমি—এই পাঁচজন মানেই ছিল আস্ত একটা উপদ্রব! এলাকায় আমাদের ‘পঞ্চপাণ্ডব’ বলা হতো। দুপুরবেলা যখন পুরো মহল্লায় সান্নিধ্য নেমে আসত, বড়রা সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমাত, ঠিক তখনই শুরু হতো আমাদের আসল মিশন।
তেমনই এক তপ্ত চৈত্র মাসের দুপুরে আমাদের মাথায় চাপল এক দুর্ধর্ষ আইডিয়া। পাশের বাড়ির রফিক চাচার গাছের ঠিক মগডালে একটা বিশাল পাকা আম ঝুলছিল। গত দুদিন ধরে আমরা পাঁচজন ওইটার দিকে নজর রাখছি। সেদিন ঠিক হলো—আজ আমটা নামাতেই হবে।
মিশন সফল করতে যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেওয়া হলো
রনি আর সাগর: গেটের বাইরে পাহারাদার। রফিক চাচা লাঠি হাতে বের হলেই ওরা শিস দিয়ে সিগন্যাল দেবে।
শরিফ আর সরফু: গাছের নিচে লুঙ্গি মেলে দাঁড়িয়ে গেল ‘ক্যাচ’ ধরার জন্য। আম যেন মাটিতে পড়ে ফেটে না যায়!
আর আমি: দলের সবচেয়ে হালকা-পাতলা, তাই গাছে চড়ার দায়িত্বটা পড়ল আমার কাঁধে।
আমি তো তরতর করে গাছে উঠে গেলাম। চারপাশ একদম নিঝুম। মগডালে পৌঁছে যেই না আমটায় হাত দিয়েছি, ঠিক তখনই গেটের ওপাশ থেকে রনি আর সাগর একসাথে তীব্র জোরে শিস দিয়ে উঠল!
হঠাৎ ওই আওয়াজে গাছের নিচে থাকা শরিফ আর সরফু একদম ভড়কে গেল। ওরা ভাবল আম বুঝি নিচে পড়ছে! আম বাঁচানোর চক্করে ওরা চোখ-কান বুজে লুঙ্গি টানটান করে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করে দিল। কিন্তু আসল টুইস্টটা অন্য জায়গায়—রনি আর সাগর আসলে রফিক চাচাকে দেখেনি, ওরা স্রেফ আমাদের সাথে ফাজলামো করার জন্য নকল শিস দিয়েছিল!
কিন্তু ডালের ওপর ওদের শিস শুনে আমার নিজের হাত-পা তো তখন কাঁপছে। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পা হড়কে আমি সোজা উপর থেকে নিচে ডাইভ দিলাম। আর ঠিক অলৌকিকভাবেই হোক কিংবা কপাল খারাপ থাকার কারণে—আমি ধপাস করে ল্যান্ড করলাম শরিফ আর সরফুর মেলে ধরা ওই লুঙ্গির ঠিক মাঝখানে!
তিনটা ধেড়ে ছেলে একসাথে মাটিতে আছাড় খেয়ে গোঙাচ্ছি, আর আমাদের পড়ার শব্দে এবার সত্যি সত্যি রফিক চাচা হুঙ্কার দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন। চাচাকে আসতে দেখেই পাহারাদার রনি আর সাগর আমাদের ফেলেই আগেই হাওয়া! আমরা তিনজন তখন ব্যথায় কুঁকড়ে আছি, কিন্তু চাচার হাতের লাঠি দেখে কোত্থেকে যে অসুরের শক্তি এল—কে কার আগে দৌড় দেব, সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। প্যান্টের ধুলোবালি মাখামাখি অবস্থাতেই জান হাতে নিয়ে এক এক জন এক এক দিকে দিলাম টান।
বিকেলে যখন আমাদের গোপন আস্তানা—সেই স্কুল মাঠের ভাঙা কালভার্টের ওপর পাঁচজনের আবার দেখা হলো, তখন আমাদের চেহারাগুলো ছিল দেখার মতো। রনি আর সাগর আমাদের দেখেই হাসতে হাসতে কালভার্ট থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা, আর আমরা তিনজন ব্যথায় শরীর ডলছি আর ওদের চড়-থাপ্পড় মারার জন্য তাড়া করছি।
সেদিন আমটা হয়তো আমাদের কপালে জোটেনি, কিন্তু শরিফ আর সরফুর মেলে ধরা লুঙ্গিতে আমার সেই ‘মহাকাব্যিক ল্যান্ডিং’ আজও আমাদের বন্ধুদের আড্ডায় উঠলে আমরা সবাই হাসতে হাসতে সোফা থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি!
// যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেওয়া হলো //
🤔