প্রথম পাতা › গল্প ও উপন্যাস › চোখের সামনে থেকেও যে সত্য দেখা যায় না

গল্প ও উপন্যাস

চোখের সামনে থেকেও যে সত্য দেখা যায় না

বিজ্ঞাপন
চোখের সামনে থেকেও যে সত্য দেখা যায় না

চোখের সামনে থেকেও যে সত্য দেখা যায় না

গোয়ার এক শান্ত পাহাড়ি শহরে স্ত্রী নন্দিনী আর দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করে বিজয় সালগাঁওকর। সে খুব সাধারণ একজন মানুষ। তার নিজের কোনো বড় পরিচয় নেই, নেই বিশেষ কোনো ক্ষমতা কিংবা প্রভাবশালী বন্ধু। একটি ছোট কেবল টিভির ব্যবসা চালিয়েই তার সংসার চলে। কিন্তু বিজয়ের মধ্যে এমন একটি গুণ আছে, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে—সে অসাধারণ মনোযোগ দিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে এবং একবার কোনো কিছু বুঝে ফেললে তা সহজে ভুলে যায় না।

বিজ্ঞাপন

সিনেমার প্রতি তার ভীষণ আগ্রহ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে সিনেমা দেখে, আর সিনেমার গল্প, চরিত্র ও পরিকল্পনা থেকে নানা কিছু শেখে। তার কাছে সিনেমা শুধু বিনোদন নয়; এটি পৃথিবীকে বোঝার একটি উপায়।

বিজয়ের সংসার ছিল শান্ত, স্বাভাবিক ও সুখের। বড় মেয়ে অঞ্জু পড়াশোনা করে, ছোট মেয়ে অনু এখনো বয়সে ছোট। স্ত্রী নন্দিনী তার সংসারের কেন্দ্রবিন্দু। বিজয় হয়তো ধনী নয়, কিন্তু পরিবারকে ভালো রাখার জন্য তার চেষ্টার কোনো কমতি নেই।

কিন্তু একদিন সেই পরিবারেই নেমে আসে এক ভয়ংকর বিপদ।

অঞ্জু একটি ক্যাম্পে গিয়ে সামের সঙ্গে পরিচিত হয়। সাম হলো পুলিশের আইজি মীরা দেশমুখের ছেলে। ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় সামের মধ্যে রয়েছে ঔদ্ধত্য। সে অঞ্জুর একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে এবং সেই ভিডিওকে অস্ত্র বানিয়ে তাকে ভয় দেখাতে শুরু করে। অঞ্জু ও তার পরিবারকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে সে।

একসময় সাম বিজয়ের বাড়িতে আসে। তার উদ্দেশ্য অঞ্জুকে আরও বেশি চাপে ফেলা এবং নিজের ক্ষমতা দেখানো। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, একটি নিরীহ মেয়েকে ভয় দেখাতে গিয়ে সে এমন এক সীমা অতিক্রম করতে যাচ্ছে, যার পরিণতি আর কখনো আগের মতো হবে না।

সেই সময় বাড়িতে ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনা।

নিজেকে এবং পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে অঞ্জু ও নন্দিনী সামের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সামের মৃত্যু হয়।

মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় সবকিছু।

যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও একটি সাধারণ পরিবারের জীবন চলছিল, সেই বাড়িই এখন হয়ে ওঠে এক ভয়ংকর অপরাধের কেন্দ্র। মা ও মেয়েরা আতঙ্কে ভেঙে পড়ে। তারা জানে, ঘটনাটি প্রকাশ পেলে তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। সামের মা শুধু একজন সাধারণ নারী নন—তিনি গোয়ার পুলিশের আইজি। তার হাতে রয়েছে ক্ষমতা, প্রভাব এবং গোটা পুলিশবাহিনীকে কাজে লাগানোর সুযোগ।

নন্দিনী বুঝতে পারে, তারা শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনার মুখোমুখি নয়; তারা এমন এক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে, যার সামনে সত্য বললেও হয়তো ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না।

ঠিক তখনই পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় বিজয়।

সে জানে, পুলিশ একদিন তাদের দরজায় আসবেই। তাই সে আবেগে ভেসে না গিয়ে ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি বিচার করতে শুরু করে। তার কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—স্ত্রী ও মেয়েদের নিরাপদ রাখা।

বিজয় কোনো অপরাধজগতের মানুষ নয়। সে কোনো পেশাদার অপরাধীও নয়। কিন্তু সে জানে, পুলিশ তদন্ত চালায় প্রমাণের ভিত্তিতে, আর মানুষের স্মৃতি সব সময় নির্ভুল হয় না। একটি ঘটনা কীভাবে দেখা হবে, কোন তথ্য কখন সামনে আসবে, আর কোন তথ্য মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে থাকবে—এসবের ওপরই অনেক সময় তদন্তের গতিপথ নির্ভর করে।

সিনেমা থেকে শেখা পর্যবেক্ষণ, মানুষের আচরণ সম্পর্কে তার ধারণা এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সে এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করে, যার উদ্দেশ্য শুধু একটি বিষয় নিশ্চিত করা—তার পরিবারের বিরুদ্ধে যেন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দাঁড় করানো না যায়।

এরপর শুরু হয় বিজয়ের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।

সে তার স্ত্রী ও মেয়েদের বোঝায়, আতঙ্কিত হয়ে পড়লে চলবে না। পুলিশ প্রশ্ন করবে, আশপাশের মানুষ কথা বলবে, নানা রকম সন্দেহ তৈরি হবে। কিন্তু তাদের নিজেদের স্মৃতি, বক্তব্য ও আচরণের মধ্যে যেন অযথা অসংগতি তৈরি না হয়। একই সঙ্গে বিজয় এমন কিছু ঘটনা ও সময়ের ধারাবাহিকতা সাজিয়ে রাখে, যা তদন্তকারীদের জন্য তার পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন করে তোলে।

সে পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যায়, খাবার খায়, ভ্রমণ করে এবং দৈনন্দিন জীবনের কিছু স্মৃতি তৈরি করে। বাইরে থেকে দেখলে এগুলো একটি পরিবারের স্বাভাবিক বেড়ানোর ঘটনা। কিন্তু বিজয়ের কাছে প্রতিটি মুহূর্তের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।

সে জানে, পরবর্তী সময়ে এই স্মৃতিগুলোই হয়ে উঠতে পারে তার পরিবারের ঢাল।

বিজয়ের পরিবারও তদন্তের আওতায় আসে। শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। পুলিশ তাদের বাড়ি তল্লাশি করে, আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলে এবং সামের নিখোঁজ হওয়ার আগে ও পরে কী ঘটেছিল, তা জানার চেষ্টা করে।

কিন্তু বিজয় যেন সব সময় এক ধাপ এগিয়ে থাকে।

পুলিশ যখন কোনো একটি সম্ভাবনা ধরে এগোয়, তখন তার পরিকল্পনা সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দেয়। কোনো একটি তথ্যের সঙ্গে অন্য তথ্য মিলিয়ে দেখতে গেলে তদন্তকারীরা এমন পরিস্থিতিতে পড়েন, যেখানে সন্দেহ তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু সেই সন্দেহকে নিশ্চিত প্রমাণে রূপান্তর করা যায় না।

মীরা ও তার স্বামী বিজয়ের ওপর মানসিক চাপ বাড়াতে থাকেন। জিজ্ঞাসাবাদ আরও কঠোর হয়। পরিবারকে ভয় দেখানো হয়, যাতে কেউ না কেউ ভেঙে পড়ে সত্য প্রকাশ করে। অঞ্জু অপরাধবোধে ভোগে। নন্দিনী মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বিজয়ও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়তে থাকে, কিন্তু পরিবারের সামনে সে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে না।

তার লড়াই এখন আর শুধু পুলিশের সঙ্গে নয়; নিজের পরিবারের ভয়, অপরাধবোধ ও মানসিক ভাঙনের সঙ্গেও।

একসময় পুলিশের নির্যাতন ও চাপের মুখে পরিবারের জন্য পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বিজয় জানে, তারা যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে এতদিনের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে।

সে নিজেকে স্থির রাখে।

তদন্ত চলতে থাকে। পুলিশ বিভিন্ন সূত্র অনুসরণ করে, সম্ভাব্য সাক্ষীদের বক্তব্য পরীক্ষা করে এবং বিজয়ের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে অন্য তথ্য মিলিয়ে দেখে। কিন্তু তার পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—পুলিশের কাছে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ থাকলেও, সেই সন্দেহকে আদালতে প্রমাণ করার মতো শক্ত ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিজয় জানে, সত্য কী ঘটেছিল তা জানার সঙ্গে আদালতে তা প্রমাণ করার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে।

মীরা এই পার্থক্য মেনে নিতে পারেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, বিজয়ই তার ছেলের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে জড়িত। কিন্তু বিশ্বাস যত দৃঢ়ই হোক, প্রমাণ ছাড়া আইনের কাছে তার মূল্য সীমিত।

এই দ্বন্দ্বই সিনেমাটিকে এক অসাধারণ মানসিক লড়াইয়ে পরিণত করে। একদিকে একজন ক্ষমতাবান পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি সত্য জানতে মরিয়া; অন্যদিকে একজন সাধারণ বাবা, যিনি নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত।

কিন্তু গল্পের সবচেয়ে বড় রহস্য তখনো প্রকাশিত হয়নি।

কিন্তু বিজয় যে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত, তা নয়। তার পরিকল্পনা সফল হলেও সে জানে, একটি পরিবারের জীবনে এমন ঘটনা কখনো সত্যিকার অর্থে মুছে যায় না। স্ত্রী ও মেয়েদের মনে ভয় এবং অপরাধবোধ থেকে যায়। আর একজন মায়ের কাছে সন্তানের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এমন ক্ষত, যা কোনো আইনি সিদ্ধান্তে সহজে সেরে ওঠে না।

সিনেমার শেষভাগে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়—বিজয়ের পরিকল্পনা যতই নিখুঁত মনে হোক, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল ভবিষ্যৎ তদন্তের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হিসাব। সে শুধু পুলিশের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়নি; সে চেষ্টা করেছিল পুলিশ কী প্রশ্ন করতে পারে, সেটিও আগে থেকে বুঝে নিতে।

এই কারণেই বিজয়কে শুধু ভাগ্যবান একজন মানুষ হিসেবে দেখা যায় না। সে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে নিজের বুদ্ধি, ধৈর্য এবং মানুষের আচরণ সম্পর্কে ধারণাকে কাজে লাগিয়েছিল।

কারণ সামের পরিবার হারিয়েছে তাদের সন্তানকে, আর বিজয়ের পরিবার বেঁচে থাকার জন্য এমন এক গোপন সত্যের ভার বহন করছে, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনে আর কখনো পুরোপুরি ফিরতে দেবে না।

শেষ পর্যন্ত দৃশ্যম দর্শককে একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—একজন বাবা যখন নিজের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য আইনের সঙ্গে বুদ্ধির লড়াইয়ে নামে, তখন তাকে কি শুধু অপরাধী হিসেবে বিচার করা যায়, নাকি তার সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা ভয়, ভালোবাসা ও অসহায়তাকেও বুঝতে হয়?

বিজয় সালগাঁওকর হয়তো একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু সে প্রমাণ করে, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি কখনো তার অর্থ, পদমর্যাদা কিংবা শারীরিক ক্ষমতা নয়। কখনো কখনো সেই শক্তি লুকিয়ে থাকে তার ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ এবং বিপদের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার ক্ষমতার মধ্যে।

আর সিনেমার নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তার পুরো দর্শন—চোখের সামনে যা দেখা যায়, সত্য সব সময় তা-ই নয়।

০ মন্তব্য · ৫৬ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!