প্রথম পাতা › গল্প ও উপন্যাস › বাঙালির শরীরে লুকিয়ে আছে ১,৫০০ বছরের এক রহস্য

গল্প ও উপন্যাস

বাঙালির শরীরে লুকিয়ে আছে ১,৫০০ বছরের এক রহস্য

বিজ্ঞাপন
বাঙালির শরীরে লুকিয়ে আছে ১,৫০০ বছরের এক রহস্য

বাঙালির শরীরে লুকিয়ে আছে ১,৫০০ বছরের এক রহস্য

ভাবুন তো—আপনার শরীরের প্রতিটি কোষে এমন এক ইতিহাস লেখা আছে, যা আপনি কখনো বইয়ে পড়েননি।

হাজার হাজার বছর আগে শিকারি-সংগ্রাহক, প্রাচীন কৃষক, দূর মধ্য এশিয়ার পশুপালক এবং পূর্বের অজানা পথিক—ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আসা এই মানুষগুলো একদিন এসে মিশে গেল একটি ভূখণ্ডে।

বিজ্ঞাপন

সেই ভূখণ্ডের নাম—বাংলা।

আর আজ কোটি কোটি বাঙালির শরীরে সেই প্রাচীন মিশ্রণের চিহ্ন বহন করে চলেছে তাদের ডিএনএ।

দক্ষিণ এশিয়ার তিন প্রাচীন শিকড়

জিনগত গবেষণা বলছে, ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ মানুষের বংশগঠনে তিনটি বড় প্রাচীন ধারার ভূমিকা রয়েছে।

প্রথমটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের ধারা। তারা লিখিত ইতিহাসের বহু আগে এই ভূখণ্ডে বসবাস করত।

দ্বিতীয়টি ইরান-সম্পর্কিত প্রাচীন কৃষকদের ধারা। হাজার হাজার বছর আগে তারা উত্তর-পশ্চিম দক্ষিণ এশিয়ায় এসে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশে যায়। এই দীর্ঘ মিশ্রণের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার মানুষের জিনগত ইতিহাসও সম্পর্কিত।

তৃতীয়টি মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চলের পশুপালকদের ধারা। প্রায় চার হাজার বছর আগে তাদের বিভিন্ন গোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করে এবং বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জিনগত গঠনে প্রভাব ফেলে।

এই তিন ধারার বিভিন্ন অনুপাতেই গড়ে উঠেছে উপমহাদেশের অসংখ্য জনগোষ্ঠী।

কিন্তু বাংলায় এসে গল্পটি বদলে যায়।

বাংলায় পাওয়া গেল চতুর্থ ধারা

বাঙালিদের ডিএনএতে গবেষকরা এমন একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান দেখতে পান, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বড় জনগোষ্ঠীতে তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

এটি পূর্ব এশিয়া-সম্পর্কিত বংশধারা।

চীন, তিব্বত, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এর জিনগত সম্পর্ক রয়েছে।

আর আশ্চর্যের বিষয় হলো—বাংলার পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে এগোলে এই উপাদানের পরিমাণ সাধারণত বাড়তে দেখা যায়।

অর্থাৎ ডিএনএর মধ্যেই যেন একটি প্রাচীন মানচিত্র আঁকা আছে।

পূর্ব দিক থেকে মানুষ এসেছে, বাংলায় বসতি গড়েছে এবং ধীরে ধীরে পশ্চিমের দিকে তাদের জিনগত প্রভাব ছড়িয়েছে।

প্রায় ১,৫০০ বছর আগে কী ঘটেছিল?

জিনগত গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রশ্ন এখানেই।

গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, বাংলার পূর্ব এশীয় বংশধারার উল্লেখযোগ্য মিশ্রণ শুরু হয়েছিল প্রায় ১,৫০০ বছর আগে—খ্রিষ্টীয় পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতকের দিকে।

অর্থাৎ এটি এমন কোনো ঘটনা নয়, যা পাথরের যুগের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।

তখন বাংলায় রাজ্য ছিল, বাণিজ্য ছিল, কৃষি ছিল, মানুষের বসতি ছিল।

সেই সময়েই পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব দিক থেকে আসা জনগোষ্ঠী বাংলার স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করে।

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের বিশাল বদ্বীপ ছিল এই মিশ্রণের জন্য আদর্শ স্থান।

কারণ বাংলা শুধু একটি উর্বর ভূমি ছিল না—এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সেতু।

বাঙালির শরীরে ইতিহাসের চার স্রোত

ফলে একজন বাঙালির জিনগত ইতিহাসকে মোটামুটি চারটি বড় স্রোতের মিলন হিসেবে দেখা যায়।

প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় অধিবাসী।

ইরান-সম্পর্কিত প্রাচীন কৃষক।

মধ্য এশিয়ার স্তেপ পশুপালক।

এবং পূর্ব এশিয়া-সম্পর্কিত জনগোষ্ঠী।

তবে মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক বাঙালির মধ্যে এই চার উপাদানের পরিমাণ এক নয়। বাংলার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কোথাও পূর্ব এশীয় উপাদান বেশি, কোথাও কম; কোথাও উত্তর ও স্তেপ-সম্পর্কিত বংশধারার প্রভাব বেশি।

অর্থাৎ “বাঙালি” কোনো একক জিনগত ছাঁচ নয়।

এটি বহু শতাব্দীর মিশ্রণের ফল।

ধর্মের সীমান্ত, কিন্তু ডিএনএর নয়

এই গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানদের জিনগত ঘনিষ্ঠতা।

আজ তাদের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্য আছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্তও রয়েছে।

কিন্তু তাদের গভীর বংশগত ইতিহাস অনেক পুরোনো।

জিনগতভাবে একই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যে মিল রয়েছে, আধুনিক রাজনৈতিক সীমারেখা তা মুছে দিতে পারেনি।

কারণ রাষ্ট্রের সীমান্ত কয়েক দশক বা কয়েক শত বছরের হতে পারে।

কিন্তু মানুষের বংশধারার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের।

তাহলে বাঙালি কারা?

সম্ভবত এই প্রশ্নের সবচেয়ে সুন্দর উত্তর হলো—বাঙালি কোনো একক জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরি নয়।

বাঙালি হলো বহু মানুষের মিলনের ফল।

এখানে আছে প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার শিকারি-সংগ্রাহকের উত্তরাধিকার। আছে কৃষির সঙ্গে আসা প্রাচীন জনগোষ্ঠীর স্মৃতি। আছে দূর স্তেপ থেকে আসা পশুপালকদের ছাপ। আর আছে পূর্বের পাহাড় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিক থেকে আসা মানুষের উত্তরাধিকার।

হাজার বছর ধরে তারা এসেছে, থেকেছে, একে অপরের সঙ্গে মিশেছে।

আর সেই মিশ্রণের ফলেই তৈরি হয়েছে আজকের বাঙালি।

তাই পরেরবার কোনো বাঙালির সঙ্গে দেখা হলে মনে রাখবেন—তার পরিচয় শুধু একটি ভাষা, একটি ধর্ম বা একটি দেশের সীমারেখায় শেষ হয় না।

তার শরীরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বহু হাজার বছরের মানবযাত্রা।

একটি বদ্বীপ।

চারটি প্রাচীন স্রোত।

অসংখ্য মানুষের মিলন।

আর তার ফল—বাঙালি।

হয়তো আমাদের পরিচয়ের সবচেয়ে বড় রহস্য কোনো ইতিহাসের বইয়ে নয়—লুকিয়ে আছে আমাদের নিজের ডিএনএর মধ্যেই।

০ মন্তব্য · ৭৭ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!