প্রথম পাতা › গল্প ও উপন্যাস › চাঁদের রাজ্যের হারানো মুকুট

গল্প ও উপন্যাস

চাঁদের রাজ্যের হারানো মুকুট

বিজ্ঞাপন
চাঁদের রাজ্যের হারানো মুকুট


অনেক অনেক বছর আগের কথা। সাত পাহাড় আর তেরো নদীর ওপারে ছিল এক আশ্চর্য রাজ্য—নাম তার চাঁদের রাজ্য। সেই রাজ্যে রাত নামলেই আকাশের চাঁদ একটু বড় হয়ে উঠত, আর চাঁদের আলোয় রাজপ্রাসাদের সোনালি মিনারগুলো ঝলমল করত।

বিজ্ঞাপন


চাঁদের রাজ্যের রাজা ছিলেন মহারাজ অরুণদেব। তিনি ছিলেন দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ। তাঁর একমাত্র কন্যা রাজকন্যা মায়া ছিল সাহসী, বুদ্ধিমতী এবং অত্যন্ত কৌতূহলী।


রাজ্যের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস ছিল একটি জাদুর মুকুট—চন্দ্রমুকুট। কথিত ছিল, এই মুকুট যার মাথায় থাকবে, সে মানুষের মনের ভালোবাসা বুঝতে পারবে এবং রাজ্যে কখনো অন্যায় হলে তা জানতে পারবে।


এক পূর্ণিমার রাতে হঠাৎ রাজপ্রাসাদে হইচই পড়ে গেল।


চন্দ্রমুকুট নেই!


সারা প্রাসাদ তন্নতন্ন করে খুঁজেও মুকুটের কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। রাজা ঘোষণা করলেন,

“যে আমার মুকুট ফিরিয়ে আনতে পারবে, তাকে রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হবে।”


অনেক সৈন্য ও যোদ্ধা মুকুট খুঁজতে বের হলো। কিন্তু কেউ ফিরে এল না।


তখন রাজকন্যা মায়া বলল,

“বাবা, আমি মুকুট খুঁজে আনব।”


রাজা চিন্তিত হয়ে বললেন,

“পথটি খুব বিপজ্জনক। সেখানে আছে অন্ধকার বন, কথা বলা পাথর আর ঘুমন্ত দৈত্য।”


মায়া মৃদু হেসে বলল,

“ভয় থাকলেই তো সাহসের প্রয়োজন হয়।”


পরদিন সকালে রাজকন্যা একা রওনা হলো।


অন্ধকার বনের কাছে গিয়ে সে দেখতে পেল একটি ছোট্ট নীল পাখি আহত হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। মায়া নিজের খাবার থেকে কিছুটা দিয়ে পাখিটিকে সাহায্য করল।


পাখিটি হঠাৎ মানুষের মতো কথা বলে উঠল,

“তুমি আমাকে সাহায্য করেছ। বিনিময়ে আমি তোমাকে একটি পথ দেখাব।”


পাখিটি তাকে বনের এমন একটি পথে নিয়ে গেল, যেখানে কোনো মানুষ আগে কখনো যায়নি।


কিছু দূর যাওয়ার পর মায়া একটি বিশাল পাথরের সামনে দাঁড়াল। পাথরটি বলল,


“আমাকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।

যে জিনিস ভাগ করলে কমে না, বরং বেড়ে যায়—সেটি কী?”


মায়া কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল,


“ভালোবাসা।”


পাথরটি সঙ্গে সঙ্গে সরে গেল।


তার পেছনে দেখা গেল একটি বিশাল গুহা।


গুহার ভেতরে বসে ছিল এক বৃদ্ধ জাদুকর। তার হাতে সেই চন্দ্রমুকুট।


মায়া বলল,

“আপনি মুকুটটি কেন চুরি করেছেন?”


জাদুকর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আমি একসময় এই রাজ্যের মানুষ ছিলাম। কিন্তু কেউ আমাকে ভালোবাসেনি। তাই ভেবেছিলাম, মুকুটটি নিয়ে আমি মানুষের মন জয় করব।”


মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“ভালোবাসা কখনো জাদুর মুকুট দিয়ে পাওয়া যায় না। ভালোবাসা পেতে হলে আগে অন্যকে ভালোবাসতে হয়।”


জাদুকরের চোখে পানি এসে গেল।


সে মুকুটটি মায়ার হাতে তুলে দিয়ে বলল,

“আজ তুমি আমাকে এমন একটি জাদু শিখিয়েছ, যা কোনো বইয়ে লেখা নেই।”


মায়া মুকুট নিয়ে রাজ্যে ফিরে এল।


রাজা আনন্দে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু মায়া পুরস্কার হিসেবে সোনা বা রত্ন কিছুই চাইল না।


সে বলল,

“বাবা, এই রাজ্যে যেন কোনো মানুষ একা না থাকে। যার ঘর নেই, তাকে ঘর দেওয়া হোক। যে ক্ষুধার্ত, তাকে খাবার দেওয়া হোক।”


রাজা মেয়ের কথা মেনে নিলেন।


সেই দিন থেকে চাঁদের রাজ্যে আর কেউ একা থাকত না।


আর সেই নীল পাখিটিকে রাজপ্রাসাদের বাগানে থাকার জন্য একটি সুন্দর ছোট্ট ঘর বানিয়ে দেওয়া হলো।


কথিত আছে, আজও পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় যদি কেউ মন দিয়ে তাকায়, তবে চাঁদের রাজ্যের সোনালি মিনারের পাশে একটি নীল পাখিকে উড়তে দেখা যায়।


আর বাতাসে ভেসে আসে একটি কথা—


“সত্যিকারের জাদু কোনো মুকুটে নয়, মানুষের ভালোবাসায়।”

০ মন্তব্য · ৪৩ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!