প্রথম পাতা › বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি › ভিনগ্রহে

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

ভিনগ্রহে

বিজ্ঞাপন
ভিনগ্রহে

মানুষ কি সত্যিই কখনো ভিনগ্রহে পা রাখতে পারবে?

 এটি এমন এক চিরন্তন প্রশ্ন যা মানবজাতি রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে যুগ যুগ ধরে করে আসছে। 

বিজ্ঞাপন

যদি আমরা ভিনগ্রহ বলতে আমাদের সৌরজগতের বাইরের অর্থাৎ কোনো দূরবর্তী নক্ষত্রমণ্ডলীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়া এক্সোপ্ল্যানেটকে বুঝি, তবে সেই গ্রহে যাত্রা করা মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন। আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রমণ্ডল হলো আলফা সেন্টোরি এবং এর অভ্যন্তরে প্রক্সিমা সেন্টোরি নামক লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত প্রক্সিমা সেন্টোরি বি নামক একটি সম্ভাব্য বাসযোগ্য এক্সোপ্ল্যানেট বা ভিনগ্রহ রয়েছে। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪.২ আলোকবর্ষ, যা কিলোমিটারের হিসাবে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। ইন্টারস্টেলার মহাকাশে মানুষের তৈরি সবচেয়ে দূরবর্তী ও দ্রুততম মহাকাশযান ভয়েজার-১ যে গতিতে ছুটছে, সেই গতিতে হিসাব করলেও প্রক্সিমা সেন্টোরিতে পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় ৭৫ হাজার বছর। অর্থাৎ, বর্তমান রকেট প্রযুক্তিতে একজন মানুষের জীবদ্দশায় ভিনগ্রহে পা রাখা একেবারেই অসম্ভব।

 ১৯০৫ সালে প্রকাশিত আলবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, শূন্য মাধ্যমে আলোর গতি হলো মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ গতিবেগের সীমা, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার। আইনস্টাইন গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন যে, ভর আছে এমন কোনো বস্তুর গতিবেগ বৃদ্ধির সাথে সাথে তার ভর তথা ভরবেগ  বাড়তে থাকে এবং ঐই বস্তুর আলোর গতিতে পৌঁছাতে অসীম শক্তির প্রয়োজন হয়। তাই কোনো মানববাহী মহাকাশযান কখনোই আলোর গতিতে বা তার চেয়ে দ্রুত চলতে পারবে না।

তবে বিজ্ঞান থেমে থাকে না। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা ভিনগ্রহের দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য কিছু চমকপ্রদ ধারণার অবতারণা করেছেন। ১৯৬৪ সালে সোভিয়েত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাই কার্দাশেভ মহাজাগতিক সভ্যতার শক্তির ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে একটি স্কেল প্রস্তাব করেন, যা "কার্দাশেভ স্কেল" নামে পরিচিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানব সভ্যতা যদি টাইপ-২ সভ্যতায় রূপ নিতে পারে, তবে পুরো নক্ষত্রের শক্তি ব্যবহার করে ইন্টারস্টেলার ভ্রমণ সম্ভব হবে। এছাড়া জেনারেশন শিপ বা বংশানুক্রমিক মহাকাশযানের ধারণাও রয়েছে, যেখানে একদল মানুষ যাত্রা শুরু করবে এবং হাজার বছর পর মহাকাশযানেই জন্ম নেওয়া তাদের বহু পরের প্রজন্ম কাঙ্ক্ষিত ভিনগ্রহে গিয়ে পা রাখবে।

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর সমাধানটি উপস্থাপন করেছিলেন মেক্সিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী মিগুয়েল অ্যালকুবিয়েরে। ১৯৯৪ সালে তিনি অ্যালকুবিয়েরে ড্রাইভ বা ওয়ার্প ড্রাইভের একটি গাণিতিক মডেল প্রকাশ করেন। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে অ্যালকুবিয়েরে দেখান যে, মহাকাশযান নিজে আলোর চেয়ে দ্রুত না চলেও স্থান-কাল বা স্পেস-টাইমকে নিজের সামনে সংকুচিত এবং পেছনে প্রসারিত করে আলোর চেয়েও দ্রুত দূরবর্তী নক্ষত্রে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। যদিও এই তাত্ত্বিক মডেল বাস্তবায়নের জন্য ঋণাত্মক শক্তি ঘনত্বের প্রয়োজন, যার বাস্তব অস্তিত্ব এখনো প্রমাণিত হয়নি।

এর বাইরেও নোবেলজয়ী মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী কিপ থর্ন স্পেস-টাইমের মধ্য দিয়ে তৈরি কাল্পনিক সুরঙ্গ বা ওয়ার্মহোল ব্যবহার করে স্থান-কালের (Space-time) মধ্যে নিরাপদ ইন্টারস্টেলার ভ্রমণ বা যাত্রা সম্ভব, এই সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনাটি উপস্থাপন করেন। তার মতে, যদি মহাবিশ্বে কোনো স্থিতিশীল ওয়ার্মহোল থেকে থাকে, তবে তা কোটি কোটি কিলোমিটার দূরত্বকে এক মুহূর্তে পার করার মাধ্যম হতে পারে। অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিলিপ লুবিনের প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে ব্রেকথ্রু স্টারশট প্রজেক্টের কাজ চলছে, যেখানে লেজার দিয়ে অতি ক্ষুদ্র যানকে আলোর গতির ২০ শতাংশ গতিতে প্রক্সিমা সেন্টোরিতে পাঠানোর গবেষণা করা হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান প্রযুক্তিতে মানুষ কোনো ভিনগ্রহে পা রাখতে পারবে না, এটি একটি প্রমাণিত সত্য। তবে বিজ্ঞানের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, আজকের সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানই ভবিষ্যতের বাস্তবতা। যদি মানবজাতি পারমাণবিক ফিউশন শক্তি, অ্যান্টিম্যাটার ইঞ্জিন কিংবা স্পেস-টাইম বাঁকানোর কৌশল আয়ত্ত করতে পারে, তবে আজ থেকে কয়েক শত বা কয়েক হাজার বছর পর মানুষের কোনো এক বংশধর সত্যিই কোনো ভিনগ্রহের মাটিতে নিজের প্রথম পদচিহ্ন এঁকে হয়তো বলবে, ​"That's one small step for man, one giant leap for mankind !"

০ মন্তব্য · ৭৩ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!