টেলিফোন কল রিসিভ করার পর ‘হ্যালো’ (Hello) বলা একটি বৈশ্বিক নিয়মে পরিণত হয়ে, যার পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানীদের প্রতিযোগিতা এবং একটি ঐতিহাসিক বিবর্তন।
অনেকের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা বা গুজব রয়েছে যে, টেলিফোনের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের প্রেমিকা বা স্ত্রীর নাম ছিল 'মার্গারেট হ্যালো' এবং তাকে ভালোবেসে তিনি এই শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন। তবে ইতিহাস অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ একটি মিথ্যা তথ্য। গ্রাহাম বেলের স্ত্রীর নাম ছিল মেবেল গার্ডিনার হাববার্ড এবং তার প্রেমিকা বা পরিচিত কারো নাম 'হ্যালো' ছিল না।
ফোনে হ্যালো বলার আসল ঐতিহাসিক কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. গ্রাহাম বেলের পছন্দ ছিল ‘আহয়’ (Ahoy)
১৮৭৬ সালে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল যখন টেলিফোন আবিষ্কার করেন, তখন দূরবর্তী যোগাযোগ স্থাপনের পর কথোপকথন শুরু করার জন্য তিনি ‘আহয়’ (Ahoy-hoy বা Ahoy শব্দটি ব্যবহারের প্রস্তাব করেছিলেন। এটি মূলত ওলন্দাজ (ডাচ) শব্দ 'hoy' থেকে এসেছে, যা সে আমলে সমুদ্রে চলাচলকারী নাবিকরা দূর থেকে একে অপরকে ডাকার বা সম্ভাষণ জানানোর জন্য ব্যবহার করতেন। গ্রাহাম বেল নিজে আজীবন ফোন ধরার পর 'আহয়' শব্দটিই ব্যবহার করে গেছেন।

২. টমাস আলভা এডিসনের ‘হ্যালো’ (Hello) প্রস্তাব
টেলিফোন আবিষ্কারের পর তা যখন বাণিজ্যিকভাবে বিস্তৃত হতে শুরু করে, তখন মানুষ বুঝতে পারে যে 'আহয়' শব্দটি ফোনের সম্ভাষণ হিসেবে খুব একটা সুবিধাজনক নয়। ১৮৭৭ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন টেলিফোনে কথা শুরুর প্রধান শব্দ হিসেবে ‘হ্যালো’ (Hello!) ব্যবহারের প্রস্তাব দেন।
তিনি পিটসবার্গের সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট অ্যান্ড প্রিন্টিং টেলিগ্রাফ কোম্পানির প্রেসিডেন্ট টি.বি.এ. ডেভিডকে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, দূর থেকে ফোনের লাইন সংযোগ পরীক্ষার জন্য এবং অপর প্রান্তের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে 'হ্যালো' শব্দটি সবচেয়ে জুতসই এবং এটি বেশ দূর থেকেও স্পষ্ট শোনা যায়।
৩. যেভাবে শব্দটি জনপ্রিয় হলো
টেলিফোন লাইনের শুরুর দিকে সরাসরি রিং হওয়ার কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ছিল না, লাইনে সবসময় সংযোগ চালু থাকত। ফলে অপর প্রান্তের মানুষ লাইনে এসেছে কি না তা নিশ্চিত হতে একটি সহজ ও জোরে উচ্চারণযোগ্য শব্দের দরকার ছিল। এডিসনের প্রস্তাবের পর ১৮৭৮ সালে কানেকটিকাটের নিউ হ্যাভেনে প্রকাশিত পৃথিবীর প্রথম টেলিফোন ডিরেক্টরি বা ফোনবুকে ব্যবহারকারীদের জন্য নির্দেশিকা দেওয়া হয় যে, তারা যেন ফোন তুলেই একটি মার্জিত ও প্রফুল্ল ভঙিতে"হ্যালো’ বলে কথা শুরু করেন।
এরপর থেকেই টেলিফোন অপারেটরদের বিশ্বজুড়ে ‘হ্যালো গার্লস’ (Hello-girls) নামে ডাকা শুরু হয় এবং সাধারণ মানুষের মুখে মুখে শব্দটি স্থায়ী রূপ পেয়ে যায়।
শব্দটির আদি উৎস
টেলিফোনে ব্যবহারের আগে ইংরেজিতে 'Hello' (বা এর আদি রূপ hullo, halloo) শব্দটি আজকের মতো স্বাভাবিক সম্ভাষণ বা 'Hi' অর্থে ব্যবহৃত হতো না। ১৮০০ শতকের শুরুর দিকে এটি মূলত কাউকে দূর থেকে ডেকে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য কিংবা কোনো বিষয়ে হঠাৎ অবাক বা বিস্মিত হলে (যেমন: "হ্যালো! এখানে কী হচ্ছে?") প্রকাশ করার জন্য ব্যবহৃত হতো।
সংক্ষেপে বলা যায়,টমাস আলভা এডিসনের দূরদর্শিতা এবং প্রথম টেলিফোন নির্দেশিকার নিয়মের কারণে আজ আমরা ফোন তুলেই বিশ্বজুড়ে সবাই ‘হ্যালো’ বলি।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!