প্রথম পাতাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমহাকর্ষের ওপারে

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

মহাকর্ষের ওপারে

মহাকর্ষের ওপারে

২০৯৬ সাল। পৃথিবীর মানুষ তখন আর শুধু এক গ্রহে সীমাবদ্ধ নেই। মঙ্গল আর চাঁদে মানুষের স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু মহাবিশ্বের এক চরম রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব পড়েছে যার ওপর, তার নাম রিয়ান। সে একজন তরুণ অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট এবং ইন্টারস্টেলার স্পেসশিপ ‘অরিয়ন-৯’-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।


বিজ্ঞাপন


রিয়ানের মিশন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক প্রজেক্ট কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল তৈরি এবং তার ভেতরে স্পেস-প্রোব পাঠ। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছিলেন, ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটির ওপারেই লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের সৃষ্টির মূল রহস্য, অন্য কোনো ডাইমেনশন বা অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা।


ল্যাবরেটরি থেকে যখন প্রথমবারের মতো একটি ক্ষুদ্র কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল সফলভাবে সক্রিয় করা হলো, তখন পুরো কন্ট্রোল রুম জুড়ে নেমে এল এক পিনপতন নীরবতা। রিয়ান কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। স্পেস-প্রোবটি ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজন বা শেষ সীমানা পার হতেই মনিটরের সমস্ত ডেটা এলোমেলো হতে শুরু করল।


হঠাৎ করেই প্রোবটি থেকে একটি সিগন্যাল ভেসে এল। কোনো কোড বা বৈজ্ঞানিক সংখ্যা নয়, সেটি ছিল একটি অডিও ফাইল। রিয়ান হেডফোনটা কানে লাগাতেই তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। স্পেস-প্রোবটির ওপার থেকে ভেসে আসছে কারোর কান্নার আওয়াজ! খুব চেনা, খুব পরিচিত এক আকুল কান্না।


রিয়ান ভালো করে শোনার চেষ্টা করল। এই কান্না আর কারও নয়, এটা তার নিজেরই গলার আওয়াজ! কিন্তু সে তো এখানে, কন্ট্রোল রুমে বসে আছে। তবে ওপারে কে কাঁদছে?


রিয়ান সিগন্যালটির ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস করতে শুরু করল। টাইম-ডাইলেটেশন বা সময়ের আপেক্ষিকতা হিসাব করে সে যা বুঝতে পারল, তাতে তার মাথা ঘুরে গেল। ব্ল্যাকহোলের ভেতরে সময় কোনো সরলরেখায় চলে না, সেখানে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ এক বিন্দুতে মিলে যায়।


আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগে, যখন রিয়ানের বয়স মাত্র দশ বছর ছিল, তখন এক ল্যাব দুর্ঘটনায় তার বিজ্ঞানী বাবা চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন। বাবা হারিয়ে যাওয়ার পর ছোট্ট রিয়ান ঘরের কোণে বসে ঠিক এভাবেই ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিল।


তার মানে, ব্ল্যাকহোলের ওপারে কোনো ভিনগ্রহী নেই, নেই কোনো অজানা শক্তি। ওপারে আছে রিয়ানের নিজেরই অতীত! বিশ বছর আগে ছোট্ট রিয়ানের সেই কান্নার শব্দ স্পেস-টাইমের চাদর ভেদ করে আজ কোটি আলোকবর্ষ দূরের এই ব্ল্যাকহোলের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।


রিয়ান বুঝতে পারল, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য কোনো জটিল সমীকরণ নয়, বরং মানুষের নিজেরই অনুভূতি, যা স্থান ও কালের সমস্ত সীমানা ভেঙে একাকার হয়ে যেতে পারে। সে অশ্রুসজল চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে প্রজেক্টের মেইন সুইচটা বন্ধ করেকিছু রহস্য না হয় মহাবিশ্বের বুকেই জমা থাক।

০ মন্তব্য · ৩৮ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!