মনে করূন আপনি এক অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে ঘড়ির কাঁটা এখনও শুরুই হয়নি। সময় নেই, স্থান নেই, এমনকি "কিছু নেই"ও নেই। কারণ "নেই" বলতেও তো একটা প্রেক্ষাপট লাগে। ঠিক এই রকম এক অবস্থা থেকেই নাকি জন্ম নিয়েছিল আমাদের গোটা মহাবিশ্ব। প্রশ্ন হলো—শূন্য থেকে কীভাবে সব কিছু এলো? বিজ্ঞানীরা যখন এই ধাঁধার উত্তর খুঁজতে গেছেন, তখন বারবার তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একটাই তত্ত্ব। যাকেই বলা হয় কোয়ান্টাম মেকানিক্স।
সাধারণ পদার্থবিজ্ঞান আমাদের শেখায়, প্রতিটি ঘটনার একটা কারণ থাকে, একটা আগের মুহূর্ত থাকে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো বিগ ব্যাং-এর "আগে" যদি সময়ই না থাকে, তাহলে কারণ খোঁজা যাবে কীভাবে? এখানেই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব হার মেনে বসে। কারণ সেই তত্ত্ব অসীম ঘনত্বের একটা বিন্দুতে গিয়ে ভেঙে পড়ে, যাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। গণিত সেখানে অকেজো হয়ে যায়, উত্তর দেয় না, শুধু অসীম বলে হাত তুলে দেয়।
ঠিক এই জায়গাতেই কোয়ান্টাম মেকানিক্স এগিয়ে আসে, ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। কোয়ান্টাম জগতে কণাগুলো সবসময় নির্দিষ্ট, পূর্বনির্ধারিত আচরণ করে না। বরং তারা চলে সম্ভাবনার নিয়মে। একটা ইলেকট্রন একই সঙ্গে বহু জায়গায় "থাকতে পারার সম্ভাবনা" নিয়ে ঘোরে, যতক্ষণ না তাকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। আর এই অনিশ্চয়তার নীতিই বলে দেয় যে শূন্যতাও আসলে ঠিক শূন্য নয়।
আসুন এটা একটু সহজ করে বলি। ধরুন, আপনি একটা সম্পূর্ণ ফাঁকা, নিস্তব্ধ সমুদ্র কল্পনা করলেন, কোনো ঢেউ নেই। কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান বলে, এমন সম্পূর্ণ শান্ত সমুদ্র বাস্তবে সম্ভবই না। কারণ হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুযায়ী, শক্তি ও সময়ের মধ্যেও একটা সীমা আছে।আপনি কখনোই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না যে কোনো এক মুহূর্তে শক্তি শূন্য। ফলে শূন্যতা নিজেই ক্ষণে ক্ষণে ছোট ছোট শক্তির ঢেউ তৈরি করে, যাকে বলা হয় - কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন। এগুলো এত ক্ষণস্থায়ী যে সাধারণত আমরা টেরই পাই না।
কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো এই ক্ষুদ্র ফ্লাকচুয়েশন থেকে কি আস্ত একটা মহাবিশ্ব তৈরি হতে পারে? বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, হ্যাঁ। যদি কোনোভাবে এমন একটা কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি নিয়ে "স্ফীত" হয়ে ওঠে, আর সেটা যদি নিজেকে ধ্বংস করার আগেই এক বিশাল সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যায়, তাহলে সেটাই হতে পারে আমাদের মহাবিশ্বের সূচনা বিন্দু। এই ধারণাকে বলা হয় কোয়ান্টাম কসমোলজি। পদার্থবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ভিলেনকিনের বিখ্যাত তত্ত্ব "শূন্য থেকে সৃষ্টি" বা creation from nothing, এই ধারণারই একটা রূপ, যেখানে মহাবিশ্ব আক্ষরিক অর্থে কোনো কারণ ছাড়াই, কোয়ান্টাম টানেলিং-এর মাধ্যমে অস্তিত্বে চলে আসে।
স্টিফেন হকিং এবং জেমস হার্টলও একসময় প্রস্তাব দিয়েছিলেন আরেকটি অসাধারণ ধারণা, যেটা হলো- "নো-বাউন্ডারি প্রোপোজাল"। তাদের মতে, সময়ও শুরুর দিকে এমনভাবে বাঁকা ছিল, যেন সেটা স্থানের মতোই আচরণ করত। ফলে "সময়ের শুরু কোথায়" জিজ্ঞেস করাটা অনেকটা পৃথিবীর উত্তর মেরুর উত্তরে কী আছে জিজ্ঞেস করার মতো, প্রশ্নটাই অর্থহীন হয়ে যায়, কারণ সীমানা বলে কিছুই নেই।
তবে এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। এই তত্ত্বগুলো এখনো সম্পূর্ণ প্রমাণিত নয়। কারণ কোয়ান্টাম মেকানিক্স আর আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এই দুটোকে একসঙ্গে মিলিয়ে একটা সম্পূর্ণ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি তত্ত্ব বানানো এখনো বিজ্ঞানের অন্যতম বড় অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ। স্ট্রিং থিওরি, লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি প্রচেষ্টা এখনো চলমান।
তাহলে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ালো? কোয়ান্টাম মেকানিক্স আমাদের নিশ্চিত উত্তর দেয় না, কিন্তু এটা আমাদের একটা অসাধারণ সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। হয়তো সৃষ্টি মানে কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেরই এক স্বাভাবিক পরিণতি। হয়তো "কিছু না থাকা" আসলে একটা অস্থিতিশীল অবস্থা, আর "কিছু থাকা"ই হলো মহাবিশ্বের স্বাভাবিক গন্তব্য।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!