প্রথম পাতাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমহাজাগতিক বুদ্বুদের নিঃশ্বাস

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

মহাজাগতিক বুদ্বুদের নিঃশ্বাস

মহাজাগতিক বুদ্বুদের নিঃশ্বাস

মহাজাগতিক বুদ্বুদের নিঃশ্বাস: হিমশীতল মেঘের চাদরে পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস


বিজ্ঞাপন

​নক্ষত্রালোকিত রাতের আকাশ দেখে মানুষ বরাবরই এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পায়। মনে হয়, মহাশূন্য এক শান্ত, নীরব ও নিরাপদ চাদরমুড়ি দিয়ে আমাদের ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে তাকালে এই মহাবিশ্ব এক অনন্ত সংগ্রামক্ষেত্র। সৌরজগতের ঠিক বাইরে বইছে প্রমত্ত আন্তঃনক্ষত্রিক বাতাস, আর তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের চিরপরিচিত পৃথিবী এক অদৃশ্য বুদ্বুদের ভেতর পরম যত্নে সংরক্ষিত। নাসার ‘SHIELD’ (Solar Energetic Heliosphere Interaction Environment) গবেষণা কর্মসূচির সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এই সুপ্রাচীন ও রক্ষাকবচসম বুদ্বুদটি—যাকে আমরা হেলিওস্ফিয়ার (Heliosphere) নামে চিনি—সব সময় এক সমান্তরালে ছিল না। মহাজাগতিক সাগরে সূর্য যখন তার দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে, তখন পথিমধ্যে তাকে পাড়ি দিতে হয় রহস্যময়, ঘন ও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আন্তঃনক্ষত্রিক মেঘের বুক চিরে।


​হেলিওস্ফিয়ার মূলত সৌর বাতাসের দ্বারা সৃষ্ট একটি বিশাল প্রতিরক্ষামূলক গম্বুজ। সূর্যের বুক থেকে ছিটকে বের হওয়া অতিক্ষুদ্র কণার স্রোত চারপাশের মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে এই বুদ্বুদটি তৈরি করে। এর মূল কাজ হলো ছায়াপথের গভীর থেকে ছুটে আসা ক্ষতিকারক মহাজাগতিক রশ্নি (cosmic radiation) এবং আন্তঃনক্ষত্রিক উপাদানের হাত থেকে আমাদের সৌরজগৎকে এক প্রকার ঢাল হয়ে রক্ষা করা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় যখন সূর্য গ্যালাক্সির ঘন মেঘমালার মধ্য দিয়ে যায়, তখন চারপাশের বাহ্যিক চাপ হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ, এই রক্ষাকবচ সংকুচিত হয়ে ছোট হয়ে আসতে পারে।


​নাসা-অর্থায়িত সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোর মডেল বলছে, আজ থেকে মিলিয়ন বা কোটি বছর আগে পৃথিবীর চারপাশের এই হেলিওস্ফিয়ারটি এমন চরম সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিল। তীব্র চাপের মুখে বুদ্বুদটি সংকুচিত হয়ে যখন সংকুচিত রূপ ধারণ করেছিল, তখন আন্তঃনক্ষত্রিক উপাদান এবং তেজস্ক্রিয় মহাজাগতিক রশ্নির একটি বড় অংশ পৃথিবীর নিকটবর্তী অঞ্চলে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছিল। গবেষকরা এখন অত্যন্ত কৌতূহলের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন যে, মহাজাগতিক এই অনুপ্রবেশের ফলে পৃথিবীর প্রাচীন জলবায়ুতে কোনো সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটেছিল কি না। তবে এটি কোনো আকস্মিক বা সাম্প্রতিক দুর্যোগের গল্প নয়; বরং কম্পিউটার মডেল ও তাত্ত্বিক পুনর্গঠনের সাহায্যে সুদূর অতীতের এক মহাজাগতিক অধ্যায়কে খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস।


​এই রহস্যের জট খুলতেই মহাশূন্যে পাড়ি জমিয়েছে নাসার সর্বাধুনিক ‘আইম্যাপ’ (IMAP) মিশন। হেলিওস্ফিয়ারের এই নাজুক সীমানা এবং আন্তঃনক্ষত্রিক মাধ্যমের মধ্যকার জটিল মিথস্ক্রিয়া নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে শুরু করেছে এই মহাকাশযান। হেলিওস্ফিয়ারের প্রান্তসীমায় সৌর বায়ু কীভাবে আন্তঃনক্ষত্রিক কণার সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং শক্তির আদান-প্রদান ঘটে, তা বুঝতে সাহায্য করছে আইম্যাপের সংগৃহীত উপাত্ত।


​মহাবিশ্বের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বড় অদ্ভুত। আমরা ভাবি পৃথিবী হয়তো এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, কিন্তু আসলে আমরা গ্যালাক্সির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোটি কোটি বছর আগে যখন সূর্য কোনো হিমশীতল মেঘের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন পৃথিবীর বুকে হয়তো বইছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো জলবায়ুর হাওয়া। নাসা এসএইচআইএলডি (NASA SHIELD) এবং আইম্যাপ (IMAP) গবেষণার হাত ধরে মানুষ আজ অতীতের সেই হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়গুলোকে পুনর্নির্মাণ করার দুঃসাহসিক স্বপ্ন দেখছে। বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মাথার ওপরের এই শান্ত নীল আকাশ আর তার পেছনের মহাজাগতিক বুদ্বুদটিই আমাদের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় ও সুন্দর ইতিকথা।


📖 ​রেফারেন্স:

১. NASA SHIELD Research Program / NASA Science

২. IMAP (Interstellar Mapping and Acceleration Probe) Mission Data & Publications


​#NASA #EarthClimate #CosmicRadiation

০ মন্তব্য · ৫১ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!