প্রথম পাতাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকোয়ান্টাম শূন্যতা

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

কোয়ান্টাম শূন্যতা

কোয়ান্টাম শূন্যতা

লরেন্স ক্রাউস তাঁর "A Universe from Nothing" বইতে যুক্তি দিয়েছেন যে কোয়ান্টাম শূন্যতা আসলে "কিছুই নয়" নয়। এটি একটি গতিশীল ক্ষেত্র, যেখানে কণা ও প্রতিকণা প্রতিনিয়ত জন্মাচ্ছে ও মিলিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, এই কোয়ান্টাম ওঠানামার ফলেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে, কোনো সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন ছাড়াই।


বিজ্ঞাপন

কিন্তু কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন অধ্যাপক ডেভিড আলবার্ট। যিনি নিজেও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ধারী তিনি এই যুক্তিকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। ২০১২ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত তাঁর পর্যালোচনায় তিনি প্রশ্ন তুলেছেন: "কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সূত্রগুলো নিজে কোথা থেকে এলো? ক্রাউস এ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই বলে তিনি প্রায় স্পষ্টভাবেই স্বীকার করেছেন।"


আলবার্টের মূল যুক্তি হলো ক্রাউস "শূন্য" শব্দটির একটি বিশেষ অর্থ ব্যবহার করছেন, যা দার্শনিকভাবে "কিছুই না"-র সাথে মেলে না। কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুসারে, "শূন্য" মানে হলো কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের একটি অবস্থা যেখানে কোনো কণা নেই। কিন্তু সেই ক্ষেত্রটি তো আছেই- তার সূত্র, নিয়ম, গাণিতিক কাঠামো সবই আছে। তাহলে এটা কেমন "শূন্য"?


আলবার্ট আরও গভীরে গিয়ে প্রশ্ন করেন: কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সূত্রগুলো কোথা থেকে এলো? ধরুন আমরা আবিষ্কার করলাম যে এই সূত্রগুলো আরও গভীর কোনো বৈশিষ্ট্য X থেকে এসেছে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—X কেন Y নয়? এই প্রশ্নের কি কোনো শেষ আছে?


ক্রাউস এই সমালোচনার জবাবে আলবার্টকে "মূর্খ দার্শনিক" বলে আখ্যা দিয়েছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে আলবার্ট কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি বোঝেন না। কিন্তু আলবার্টের প্রশ্নটি দার্শনিকভাবে বৈধ এবং বিজ্ঞান এর উত্তর দিতে পারে না।


ডিসকভার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে: "আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও cosmology-র অগ্রগতি কি আমাদের এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে সাহায্য করে। কেন মহাবিশ্ব নামের কিছু আছে, কেন পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র নামের কিছু আছে, কেন সেই সূত্রগুলো কোয়ান্টাম মেকানিক্সের রূপ নেয়? এক কথায়: না।"


আলবার্টের সমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি ধর্মীয় নন, বরং একজন নাস্তিক দার্শনিক। তাঁর আপত্তি ক্রাউসের বৈজ্ঞানিক দাবির অতিরঞ্জন নিয়ে, ধর্মীয় বিশ্বাসের পক্ষে নয়। ফিল স্টিলওয়েল তাঁর গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যে ক্রাউস "শূন্য" শব্দটির একটি কারিগরি অর্থ (কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম) এবং আরেকটি মেটাফিজিক্যাল অর্থ (সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি) গুলিয়ে ফেলেছেন।


ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এক পর্যালোচনায় আরও চমকপ্রদ একটি বিষয় উঠে এসেছে: "যদি কেউ শূন্যের একটি স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা ব্যবহার করেন। যেমন সিস্টেমের সর্বনিম্ন শক্তি অবস্থা তাহলে শ্রোডিঙ্গার সমীকরণের একটি সরল পরিণতি হলো এই অবস্থা কখনোই অন্য কোনো অবস্থায় রূপান্তরিত হবে না। সুতরাং যতদিন আমরা প্রচলিত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মধ্যে আছি, বর্তমান বিজ্ঞান ধর্মতত্ত্ববিদদের পক্ষে: শূন্য থেকে সর্বদা শূন্যই আসবে।"


অর্থাৎ, কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়ামের ওঠানামা আসলে প্রকৃত অস্থিরতা নয়। এটি ক্লাসিকাল ভাষার একটি বিভ্রান্তিকর প্রয়োগ। প্রকৃত কোয়ান্টাম গ্রাউন্ড স্টেট স্থির ও অপরিবর্তনীয়।


আলবার্টের সমালোচনা শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নে পৌঁছায়: "কিছু আছে, শূন্য নয়" এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান দিতে পারে না, কারণ বিজ্ঞান নিজেই এই প্রশ্নের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করছে। বিজ্ঞান আমাদের বলে কীভাবে মহাবিশ্ব কাজ করে, কিন্তু কেন কিছু আছে কিছু নেই না- এই "কেন"-এর উত্তর বিজ্ঞানের পদ্ধতিগত সীমার বাইরে।


যাইহোক, সবকিছুকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির মধ্যে না এনে মহাবিশ্বকে নিজের মতোই অস্তিত্বশীল থাকতে দেওয়া ভালো, নাকি আমরা আমাদের নিজেদের সীমার মধ্যে তার বিশাল ও অসীমতাকে ব্যবচ্ছেদ করতে চাই সেটাই এখন বড় চিন্তার বিষয়। কারণ এমনও তো হতে পারে যে অনিয়ম বা অবাস্তবতাই বাস্তবতাকে উজ্জ্বল ও দৃশ্যমান করে তোলে! 


(ভিডিও স্ক্রিপ্ট থেকে, সংক্ষিপ্তরূপ)


#UniverseFromNothing #LawrenceKrauss #DavidAlbert #QuantumMechanics #cosmology

০ মন্তব্য · ৫৪ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!