বিদ্যুৎ ছাড়াই আলো ছড়াবে গাছ! চীনা বিজ্ঞানীদের বিস্ময়কর আবিষ্কার
ভাবুন তো—রাতের অন্ধকারে কোনো বৈদ্যুতিক বাতি নেই, নেই কোনো তার বা বিদ্যুতের খুঁটি। অথচ রাস্তার পাশে থাকা গাছ, ফুল ও উদ্ভিদগুলোই মৃদু আলো ছড়িয়ে চারপাশ আলোকিত করছে। শুনতে কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতো লাগলেও জৈব-আলোকোজ্জ্বল (Bioluminescent) উদ্ভিদ তৈরির প্রযুক্তি এখন বাস্তব গবেষণার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
ছবিতে বলা হয়েছে, চীনা বিজ্ঞানীরা জোনাকির ডিএনএ উদ্ভিদের মধ্যে সংযোজন করে এমন গাছ তৈরি করেছেন, যা নিজে থেকেই আলো ছড়াতে পারে। বিষয়টি পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়, তবে বাস্তব প্রযুক্তিটি ছবির লেখার চেয়েও একটু বেশি জটিল।
🌿 কীভাবে গাছ আলো ছড়ায়?
জোনাকি অন্ধকারে আলো তৈরি করে একটি বিশেষ জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সেই আলো তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত জিন ব্যবহার করে উদ্ভিদকে আলোকোজ্জ্বল করার চেষ্টা করছেন। ১৯৮৬ সালেই গবেষণায় জোনাকির luciferase জিন উদ্ভিদে ব্যবহার করে আলো উৎপাদন দেখানো হয়েছিল। �
PubMed
তবে পুরোনো পদ্ধতির বড় সমস্যা ছিল—আলো তৈরি করতে উদ্ভিদের বাইরে থেকে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান সরবরাহ করতে হতো এবং আলোও ছিল অত্যন্ত দুর্বল।
সাম্প্রতিক গবেষণায় পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। উদাহরণস্বরূপ, উদ্ভিদের নিজস্ব বিপাকীয় উপাদান caffeic acid ব্যবহার করে স্বয়ংসম্পূর্ণ আলোক-উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। ২০২৫ সালে Zhejiang University-এর গবেষকরা জ্বলজ্বলে ছত্রাকের জৈব-আলোক ব্যবস্থা ব্যবহার করে এমন উদ্ভিদ তৈরি করার কথা জানিয়েছিলেন, যেগুলো বাহ্যিক বিদ্যুৎ বা আলাদা রাসায়নিক যোগ ছাড়াই দৃশ্যমান আলো দিতে পারে। �
Zhejiang University +1
✨ চীনের নতুন উদ্যোগ
২০২৬ সালে চীনের Magicpen Bio-এর সঙ্গে যুক্ত গবেষকরা জোনাকি ও আলোকোজ্জ্বল ছত্রাকের জিন ব্যবহার করে ২০টিরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদকে রাতের বেলায় আলো ছড়ানোর উপযোগী করার কথা জানিয়েছেন। এসবের মধ্যে অর্কিড, সূর্যমুখী ও চন্দ্রমল্লিকার মতো উদ্ভিদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। �
euronews +1
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—এই আলো এখনো সাধারণ বৈদ্যুতিক স্ট্রিটলাইটের বিকল্প নয়। বর্তমানে উৎপন্ন আলো মূলত নরম ও মৃদু; একটি রাতের বাতি বা সাজসজ্জার আলোর সঙ্গে তুলনা করা বেশি বাস্তবসম্মত। �
Yahoo Tech
🏙️ তাহলে কি ভবিষ্যতে রাস্তার বাতি লাগবে না?
সম্ভাবনাটি অবশ্যই আকর্ষণীয়। ভবিষ্যতে যদি বিজ্ঞানীরা আলোর তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির সঙ্গে এই প্রযুক্তির সামঞ্জস্য আরও উন্নত করতে পারেন, তাহলে পার্ক, উদ্যান, পর্যটনকেন্দ্র, হাঁটার পথ কিংবা শহরের সৌন্দর্যবর্ধনে এর ব্যবহার হতে পারে।
একটি পার্ক কল্পনা করুন—চারপাশে বিদ্যুতের তার নেই, কিন্তু গাছ ও ফুলগুলো মৃদু সবুজ বা নীলাভ আলো ছড়াচ্ছে। এতে শহরের পরিবেশ আরও প্রাকৃতিক ও নান্দনিক হতে পারে।
⚠️ তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে
প্রযুক্তিটি যতটা চমকপ্রদ, বাস্তব প্রয়োগ ততটাই কঠিন। বর্তমানে আলোর উজ্জ্বলতা, কতক্ষণ আলো থাকবে, উদ্ভিদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য, উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবেশে জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত উদ্ভিদের সম্ভাব্য প্রভাব—এসব বিষয় নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক পর্যালোচনাতেও বলা হয়েছে যে জৈব-আলোকোজ্জ্বল উদ্ভিদ প্রযুক্তি দ্রুত এগোলেও কার্যকর বৃহৎ পরিসরের ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। �
Frontiers
🌱 প্রকৃতি ও প্রযুক্তির এক নতুন মিলন
জোনাকির ছোট্ট আলো থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছেন যেখানে গাছ শুধু অক্সিজেন বা সৌন্দর্যই দেবে না, আলোও দিতে পারে।
আজ হয়তো এই আলো দিয়ে পুরো শহরের রাস্তা আলোকিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু গবেষণা যদি আরও এগিয়ে যায়, ভবিষ্যতের কোনো এক রাতে হয়তো শহরের পার্কে প্রবেশ করতেই দেখা যাবে—বাতির খুঁটির বদলে গাছগুলোই নরম আলোয় পথ দেখাচ্ছে।
এটি কেবল আলো তৈরির নতুন প্রযুক্তি নয়; এটি মানুষের তৈরি অবকাঠামো ও জীবন্ত প্রকৃতিকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর একটি সম্ভাবনাময় দৃষ্টান্ত। 🌿✨
এই টা কি আসলেই সম্ভব!!!