এখানে একটা দারুণ ঐতিহাসিক রহস্য আছে। মানুষ একদিনে জানতে পারেনি যে পৃথিবী ঘুরছে। ধারণাটি বহু শতাব্দী ধরে তৈরি হয়েছে, কিন্তু সরাসরি পরীক্ষায় পৃথিবীর ঘূর্ণন দেখানো যায় অনেক পরে।
প্রাচীন গ্রিসেই কিছু দার্শনিক ভাবতেন পৃথিবী হয়তো স্থির নয়। কিন্তু অ্যারিস্টটলের প্রভাবশালী মত ছিল, পৃথিবী স্থির এবং সূর্য-চাঁদ-নক্ষত্র পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। তাঁর যুক্তি ছিল: "পৃথিবী যদি এত দ্রুত ঘুরত, তাহলে আমরা তার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখতে পেতাম।" আর এই ভূকেন্দ্রিক ধারণাই প্রায় এক হাজার বছর প্রধান মত হিসেবে টিকে ছিল।
এরপর নিকোলাস কোপার্নিকাস ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে একটি বিপ্লবী ধারণা দেন। তাঁর মতে, পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর প্রতিদিন একবার ঘোরে এবং একই সঙ্গে সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তিনি ১৫৪৩ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে এই মডেল প্রকাশ করেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো—কোপার্নিকাস ধারণাটি প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু পৃথিবীর ঘূর্ণনের সরাসরি পরীক্ষামূলক প্রমাণ তাঁর হাতে ছিল না।
তারপর গ্যালিলিও ও কেপলারের কাজ পৃথিবী-কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণাকে দুর্বল করে। বিশেষ করে গ্যালিলিও ১৬১০ সালে বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করেন, যা দেখায়, সবকিছু যে পৃথিবীকেই কেন্দ্র করে ঘুরবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
কিন্তু প্রশ্নের আসল উত্তর আসে ১৮৫১ সালে।।ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী লেয়ন ফুকো একটি দীর্ঘ দোলক ব্যবহার করে পৃথিবীর ঘূর্ণনকে সরাসরি দৃশ্যমান করে দেন। এটিই বিখ্যাত Foucault pendulum। দোলকটি যখন সামনে-পেছনে দুলছিল, তখন তার দোলনের সমতল যেন ধীরে ধীরে ঘুরে যাচ্ছিল। আসলে দোলকটি নিজের জড়তার কারণে প্রায় একই সমতলে দুলতে থাকছিল।ঘুরছিল পৃথিবী, দোলক নয়।
১৮৫১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি প্যারিস অবজারভেটরিতে ফুকো পরীক্ষাটি প্রদর্শন করেন। পরে প্যারিসের Panthéon-এ আরও বিশাল দোলক দিয়ে পরীক্ষাটি করা হয় এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন মানুষের চোখের সামনে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ প্রাচীন যুগেও পৃথিবী ঘোরে, এমন ধারণা ছিল, কিন্তু গ্রহণযোগ্য প্রমাণ ছিল না। ১৫৪৩: কোপার্নিকাস বলেন, পৃথিবী নিজ অক্ষে ঘোরে এবং সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে।
১৬০০–১৭০০: গ্যালিলিও, কেপলার ও নিউটনের কাজ এই নতুন মহাজাগতিক ছবিকে শক্তিশালী করে।
১৮৫১: ফুকোর দোলক পৃথিবীর ঘূর্ণনের একটি সরাসরি, দৃশ্যমান পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেয়।
আর মজার ব্যাপার হলো, আজও আমরা পৃথিবীর ঘূর্ণন সরাসরি অনুভব করি না। কারণ আমরা, আমাদের চারপাশের বায়ু, সমুদ্র এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠ সবকিছুই একসঙ্গে ঘুরছি। NASA-এর হিসাব অনুযায়ী পৃথিবী নিজের অক্ষে প্রায় ২৩.৯ ঘণ্টায় একবার ঘোরে।
#EarthRotation #FoucaultPendulum #HistoryOfScience #ScienceHistory #astronomy
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!