প্রথম পাতাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকোয়াসার - QUASAR

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

কোয়াসার - QUASAR

কোয়াসার - QUASAR

মহাকাশে এমন কিছু বস্তু আছে, যেগুলো দেখতে একটি ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো। অথচ সেই বিন্দু থেকে বেরিয়ে আসতে পারে এমন বিপুল পরিমাণ শক্তি, যা একটি সম্পূর্ণ গ্যালাক্সির কোটি কোটি নক্ষত্র একসঙ্গে আলো ছড়ালেও সহজে তৈরি করতে পারত না। এই অদ্ভুত মহাজাগতিক বস্তুর নাম কোয়াসার। নামটি এসেছে quasi-stellar radio source থেকে, অর্থাৎ দেখতে নক্ষত্রের মতো, কিন্তু আসলে নক্ষত্র নয়।


বিজ্ঞাপন

কোয়াসারের গল্প শুরু হয়েছিল বিশ শতকের মাঝামাঝি। তখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এমন কিছু শক্তিশালী রেডিও উৎস শনাক্ত করেন, যাদের অবস্থান আকাশে অত্যন্ত ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো মনে হচ্ছিল। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে 3C 48 এবং পরে 3C 273-এর মতো উৎস বিজ্ঞানীদের বিভ্রান্ত করে। অপটিক্যাল টেলিস্কোপে এগুলোকে অনেকটা নক্ষত্রের মতো দেখালেও তাদের আলো ছিল অস্বাভাবিক এবং বর্ণালিতে এমন রেখা দেখা যাচ্ছিল যার প্রকৃতি তখন বোঝা কঠিন ছিল।


১৯৬৩ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্টেন শ্মিট 3C 273-এর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র খুঁজে পান। তিনি বুঝতে পারেন, এর বর্ণালির রেখাগুলো আসলে পরিচিত হাইড্রোজেন রেখা, কিন্তু মহাবিশ্বের প্রসারণের কারণে সেগুলো প্রচণ্ডভাবে redshift বা লোহিত সরণে সরে গেছে। অর্থাৎ 3C 273 কোনো কাছাকাছি অদ্ভুত নক্ষত্র নয়; এটি আমাদের থেকে বিপুল দূরের একটি বস্তু।


এখানেই রহস্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। এত দূরের একটি বস্তু যদি পৃথিবী থেকে এত উজ্জ্বল দেখা যায়, তাহলে তার প্রকৃত শক্তি উৎপাদন কতটা হতে পারে?


পরবর্তী গবেষণায় ধীরে ধীরে উত্তরটি স্পষ্ট হতে থাকে। কোয়াসার আসলে কোনো আলাদা ধরনের নক্ষত্র নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো একটি সক্রিয় গ্যালাক্সির কেন্দ্র, যেখানে একটি অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর বা supermassive black hole তার চারপাশের পদার্থকে প্রচণ্ড গতিতে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে।


কৃষ্ণগহ্বর নিজে আলো ছাড়ে না। তাহলে কোয়াসার এত উজ্জ্বল হয় কীভাবে?


রহস্যটি কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে।।গ্যাস, ধূলিকণা এবং অন্যান্য পদার্থ কৃষ্ণগহ্বরের দিকে পড়তে পড়তে একটি ঘূর্ণায়মান accretion disk তৈরি করে। এই পদার্থ সরাসরি কৃষ্ণগহ্বরে পড়ে যায় না; প্রচণ্ড মহাকর্ষের কারণে তা অত্যন্ত দ্রুত ঘুরতে থাকে। ঘর্ষণ ও অন্যান্য ভৌত প্রক্রিয়ায় পদার্থের তাপমাত্রা বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়। সেই উত্তপ্ত accretion disk থেকেই প্রচণ্ড বিকিরণ বের হয়।


এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। কোয়াসারের শক্তির উৎস সাধারণ পারমাণবিক fusion নয়। সূর্যের মতো একটি নক্ষত্র তার কেন্দ্রে হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে রূপান্তর করে শক্তি উৎপন্ন করে। কিন্তু কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের accretion প্রক্রিয়ায় পদার্থের মহাকর্ষীয় শক্তি বিকিরণে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।


আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কিছু কোয়াসার থেকে relativistic jet বা আপেক্ষিকতাবাদী জেট বের হতে পারে। কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন, চৌম্বকক্ষেত্র এবং accretion disk-এর জটিল মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে আলোর গতির কাছাকাছি বেগে কণা মহাকাশে ছুটে যেতে পারে। কখনও এই জেটের দৈর্ঘ্য কয়েক হাজার থেকে কয়েক মিলিয়ন আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।


কিন্তু কোয়াসারের রহস্য শুধু তাদের শক্তিতে নয় তাদের ইতিহাসেও। আমরা যখন একটি দূরবর্তী কোয়াসার দেখি, তখন আসলে তার বর্তমান অবস্থা দেখি না। আমরা তার বহু বিলিয়ন বছর আগের অবস্থা দেখি। কারণ আলোকে আমাদের কাছে পৌঁছাতে বিপুল সময় লাগে। ফলে দূরবর্তী কোয়াসারগুলো এক অর্থে মহাবিশ্বের অতীতের জানালা।


জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রাচীন মহাবিশ্বে কোয়াসার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে মহাবিশ্বের কয়েক বিলিয়ন বছর বয়সের সময়ে বিপুল সংখ্যক luminous quasar দেখা যায়। এর অর্থ হলো, মহাবিশ্বের অতীতে বহু গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বর অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে পদার্থ গ্রাস করছিল।


এখানেই আরেকটি বড়োরকমের প্রশ্ন আসে: এই বিশাল কৃষ্ণগহ্বরগুলো এত দ্রুত কীভাবে তৈরি হলো?


প্রাচীন মহাবিশ্বে এমন কিছু কোয়াসার আমরা দেখতে পাই, যাদের আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে ১৩ বিলিয়নেরও বেশি বছর সময় নিয়েছে। অর্থাৎ মহাবিশ্ব যখন তার বর্তমান বয়সের তুলনায় অত্যন্ত তরুণ ছিল, তখনই কিছু কৃষ্ণগহ্বরের ভর সূর্যের কয়েক কোটি বা কয়েকশো কোটি গুণে পৌঁছে গিয়েছিল।


এটি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।কৃষ্ণগহ্বর কি প্রথমে তুলনামূলক ছোট ছিল এবং দ্রুত পদার্থ গ্রাস করে বড় হয়েছে? নাকি প্রাথমিক মহাবিশ্বে আরও বড় “seed black hole” তৈরি হয়েছিল? নক্ষত্রের মৃত্যু, সরাসরি গ্যাসের পতন, কিংবা একাধিক কৃষ্ণগহ্বরের একীভবন—কোন প্রক্রিয়া প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তা এখনও সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়।


কোয়াসার তাই শুধু মহাজাগতিক আলো নয়, এগুলো কৃষ্ণগহ্বরের বৃদ্ধির ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।আরেকটি আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, কোয়াসার তাদের আশেপাশের গ্যালাক্সিকেও প্রভাবিত করতে পারে। কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের পদার্থ থেকে বের হওয়া বিপুল শক্তি এবং জেট আশেপাশের গ্যাসকে উত্তপ্ত বা দূরে ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে নতুন নক্ষত্র তৈরির হার কমে যেতে পারে। আবার অন্য পরিস্থিতিতে গ্যাসের গতিবিধি পরিবর্তিত হয়ে নক্ষত্র গঠনের ওপর ভিন্ন প্রভাবও পড়তে পারে।


অর্থাৎ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা একটি কৃষ্ণগহ্বর শুধু গ্যালাক্সির ভেতরের একটি অদৃশ্য বস্তু নয়। তার সক্রিয় পর্যায় পুরো গ্যালাক্সির বিবর্তনেও ভূমিকা রাখতে পারে।


তবে সব supermassive black hole কোয়াসার নয়। আমাদের নিজেদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে Sagittarius A* নামে একটি supermassive black hole রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এটি অত্যন্ত দুর্বলভাবে সক্রিয়। তার চারপাশে এমন বিপুল পরিমাণ পদার্থ জমা হচ্ছে না যে সেটি একটি উজ্জ্বল কোয়াসারের মতো হয়ে উঠবে।


এ থেকে বোঝা যায়, কোয়াসার মূলত একটি কৃষ্ণগহ্বরের পরিচয় নয়, তার সক্রিয় অবস্থার একটি পর্যায়।একটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বর কোনো এক সময় প্রচণ্ডভাবে পদার্থ গ্রাস করে উজ্জ্বল active galactic nucleus বা AGN হয়ে উঠতে পারে। সেই সক্রিয় পর্যায় শেষ হয়ে গেলে একই কৃষ্ণগহ্বর তুলনামূলক শান্ত অবস্থায় চলে যেতে পারে।


আজ কোয়াসারকে আমরা মহাবিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্থায়ী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উৎসগুলোর একটি হিসেবে জানি। কিন্তু একসময় এগুলো ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধাঁধাগুলোর একটি।


১৯৬০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা জানতেন না, এই ক্ষুদ্র বিন্দুগুলো আসলে কী। কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণ, spectroscopy, radio astronomy, X-ray astronomy এবং মহাকাশ টেলিস্কোপের তথ্য ধীরে ধীরে সেই রহস্যের পর্দা সরিয়েছে।


আজ আমরা জানি কোয়াসারের আলো আসছে একটি মহাজাগতিক দৈত্যের চারপাশ থেকে। কিন্তু সেই দৈত্য নিজে অন্ধকার। আলো তৈরি করছে তার চারপাশে ঘূর্ণায়মান পদার্থ, আর সেই আলো আমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে মহাবিশ্বের বহু বিলিয়ন বছর আগের ইতিহাস।


আকাশের একটি ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু দেখে আমরা হয়তো ভাবি, সেখানে একটি নক্ষত্র রয়েছে। অথচ সেই বিন্দুর পেছনে থাকতে পারে একটি পুরো গ্যালাক্সির কেন্দ্র, একটি অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর, কয়েক কোটি সূর্যের সমান ভর, এবং এমন শক্তির বিস্ফোরণ যা কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকেও আমাদের টেলিস্কোপে ধরা পড়ে।


#Quasar #Quasars #Astronomy #Astrophysics #blackholeairsoftfield

০ মন্তব্য · ৪৫ ভিউ
মন্তব্য

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন

লগইন করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!