আপনার ডিএনএ কেবল কোনো জৈবিক অংশ নয়, এটি আসলে ৪ বিলিয়ন বছরের পুরনো একটি হার্ডড্রাইভ!
আমরা যখন 'হার্ডড্রাইভ' বা 'মেমোরি কার্ড' শব্দগুলো শুনি, আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সিলিকন চিপ, তার আর প্লাস্টিকের তৈরি কিছু আধুনিক যন্ত্রাংশ। আমরা ভাবি, তথ্য সংরক্ষণ করার প্রযুক্তি বুঝি মানুষেরই এক আধুনিক আবিষ্কার। কিন্তু তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান আর মলিকুলার বায়োলজির সমীকরণগুলো মেলালে একটি অবিশ্বাস্য সত্য সামনে আসে, প্রকৃতি আজ থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন (৪০০ কোটি) বছর আগেই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী জৈবিক ডিজিটাল স্টোরেজ ডিভাইসটি তৈরি করে রেখেছিল! আর সেই ডিভাইসটি অন্য কোথাও নয়, আক্ষরিক অর্থেই রয়েছে আপনার এবং আমার শরীরের প্রতিটি কোষে। চলুন, আজ আমাদের চেনা জীববিজ্ঞানের গণ্ডি পেরিয়ে, ইনফরমেশন থিওরির চশমা চোখে দিয়ে একটি রোমাঞ্চকর 'থট এক্সপেরিমেন্ট' বিশ্লেষণ করি।
কল্পনা করুন, মানুষের তৈরি আধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী স্টোরেজ সিস্টেমের কথা। একটি সাধারণ মেমোরি কার্ডে আমরা গিগাবাইট (GB) বা টেরাবাইট (TB) হিসাব করি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, মাত্র ১ গ্রাম ডিএনএ (DNA)-এর ভেতরে প্রায় ২১৫ পেটাবাইট তথ্য নিখুঁতভাবে জমা রাখা সম্ভব! সহজ ভাষায়, ১ পেটাবাইট মানে ১০ লক্ষ গিগাবাইট। অর্থাৎ, মাত্র এক গ্রাম ওজনের ডিএনএ-র ভেতর মানুষের তৈরি কোটি কোটি হার্ডড্রাইভের সমান তথ্য ধরে রাখা যায়।
আজ পুরো পৃথিবীর সমস্ত ডেটা সেন্টার বা ক্লাউড স্টোরেজে যত তথ্য আছে, সেগুলোকে যদি আমরা ডিএনএ-র ভেতরে সংরক্ষণ (Store) করি, তবে মাত্র একটি ছোট ল্যাপটপের ব্যাগের সমান ডিএনএ-তেই পুরো পৃথিবীর ইন্টারনেটকে বন্দি করে ফেলা সম্ভব!
বাইরে থেকে দেখলে ডিএনএ-কে স্রেফ জৈব-রাসায়নিক অণু মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে জুম-ইন করলে দেখা যাবে এটি মূলত চার-ভিত্তিক একটি ডিজিটাল কোড।
কম্পিউটার যেমন চলে 0 আর 1-এর বাইনারি কোডে, প্রকৃতির তৈরি এই ডিএনএ হার্ডড্রাইভটি চলে চারটি রাসায়নিক অক্ষরের কোডে- Adenine (A), Thymine (T), Cytosine (C), এবং Guanine (G)। এখন আমরা যদি কম্পিউটার কোডিংয়ের নিয়মে 'A' কে 00, 'T' কে 01, 'C' কে 10 আর 'G' কে 11 ধরে নিই, তবে কি জাদুকরী উপায়ে আপনার পুরো শরীরের বায়োলজিক্যাল ডেটা কোটি কোটি 0 আর 1-এর একটি লম্বা লাইনে রূপান্তর হয়ে যায় না? কম্পিউটার যেভাবে কোড রিড করে স্ক্রিনে সিনেমা বা ছবি ফুটিয়ে তোলে, আপনার কোষের ভেতরের রাইবোসোম ঠিক একইভাবে এই A, T, C, G কোড রিড করে আপনার রক্ত, মাংস, হাড় আর অস্তিত্বের নকশা তৈরি করে।
এবার আমাদের কল্পনার লেন্সটিকে একটু ঘুরিয়ে নেওয়া যাক সময়ের মহাজাগতিক স্কেলে।
মানুষের তৈরি হার্ডড্রাইভ সর্বোচ্চ ১০ থেকে ২০ বছর ভালো থাকে, তারপর ডেটা নষ্ট হতে শুরু করে। কিন্তু ডিএনএ? বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আজ থেকে ৪০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে প্রথম যে এককোষী প্রাণের জন্ম হয়েছিল, সেই আদিম জীবটি প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে টিকে ছিল, তার বেঁচে থাকার সমস্ত 'লজিক' এবং 'ডাটা'র সূচনা হয়েছিলো। আজ সেই ডাটা কপি-পেস্ট হতে হতে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিবর্ধিত ডিএনএ-তে এসে পৌঁছেছে। এই চার বিলিয়ন বছরে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছে, মহাদেশগুলো ভেঙে আলাদা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতির তৈরি এই আদিম হার্ডড্রাইভের কোড একবিন্দুও হারায়নি। এটি আক্ষরিক অর্থেই পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নিখুঁত এবং সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী 'অ্যান্টি-ভাইরাস' ও 'ডাটা ব্যাকআপ' সিস্টেম!
আমরা যখন নিজেদের আয়নায় দেখি, আমরা ভাবি আমরা বুঝি স্রেফ কিছু রক্ত-মাংসের হাড়গোড়। কিন্তু ইনফরমেশন ফিজিক্স এবং আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, আপনি আসলে ৪০০ কোটি বছর ধরে সংরক্ষিত থাকা এক মহাজাগতিক তথ্যের জীবন্ত লাইব্রেরি। আপনার জন্ম কোনো শূন্যতা থেকে হয়নি; পৃথিবীর প্রথম প্রাণ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কোটি কোটি বছরের প্রতিটি লড়াই, প্রতিটি জয় আর প্রতিটি অভিজ্ঞতার ডেটা আপনার অজান্তেই আপনার শরীরের হার্ডড্রাইভে সংরক্ষিত আছে।
তাই লজিক্যালি ভাবলে, মানুষের তৈরি মেমোরি কার্ডগুলো স্রেফ প্রকৃতির এই পরম সুন্দর এবং আদিম ডিজিটাল কোডের একটি ক্ষুদ্র অনুকরণ মাত্র। প্রকৃতির এই অনন্ত ডাটাবেজে আপনার আমার অস্তিত্বের প্রতিটি পাতা ইতিমধ্যেই এক অমর এবং অবিসংবাদিত কোডে চিরকালের জন্য সংরক্ষিত হয়ে আছে!
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!