মহাবিশ্বের শেষ সীমা: যেখানে ভেঙে পড়ে স্থান-কালের মসৃণ চাদর!
মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি হলো স্থান-কাল (Space-time)। সাধারণভাবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বকে একটি মসৃণ ও চার-মাত্রিক চাদরের সাথে তুলনা করা হয়। কিন্তু এই চাদর সদৃশ স্থান-কালকে যদি আমরা ক্রমশ ছোট করতে করতে একদম অতিক্ষুদ্র পর্যায়ে নিয়ে যাই, তবে কি এই মসৃণতা বজায় থাকবে?
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের উত্তর হলো 'না'। একটি নির্দিষ্ট অতিক্ষুদ্র সীমানায় গিয়ে স্থান-কালের এই মসৃণ চাদরটি আর স্থির থাকে না, বরং তা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল হয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করে। এই চরম সীমানাকেই বলা হয় প্ল্যাঙ্ক স্কেল (Planck Scale)। চলুন এই বিষয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা যাক:
মসৃণ চাদর সদৃশ্য স্থান-কালকে ভাঙতে যে শক্তির প্রয়োজন, তাকে বলা হয় প্ল্যাঙ্ক শক্তি (Planck Energy), যার মান প্রায় 10^28 eV । তবে শুধু বিশাল শক্তি থাকলেই স্থান-কাল ভেঙে পড়ে না, আসল শর্ত হলো শক্তি ঘনত্ব (Energy Density)। অর্থাৎ, এই বিশাল পরিমাণ শক্তিকে যখন প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যের ( 10^{-35} meter) মতো অত্যন্ত ক্ষুদ্র জায়গায় পুঞ্জীভূত বা সংকুচিত করা হয়, কেবল তখনই স্থান-কালের মসৃণ জ্যামিতিটি ভেঙে পড়ে।
প্ল্যাংক শক্তি কতটা শক্তিশালী?
মানুষের তৈরি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কণা ত্বরক যন্ত্র 'লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার' (LHC) সর্বোচ্চ 10^13 eV শক্তি তৈরি করতে পারে। প্ল্যাঙ্ক শক্তি এর চেয়েও প্রায় সূচকে ১৫টি শূন্যের ব্যবধানে (১০ লাখ কোটি গুণ) বেশি শক্তিশালী!
পদার্থ বিজ্ঞানের দুটি প্রধান শাখা - আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব (যা গ্রহ-নক্ষত্রসহ বৃহৎ স্কেলে মহাকর্ষ ব্যাখ্যা করে) এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার (যা অতিক্ষুদ্র কণার কোয়ান্টাম জগৎ ব্যাখ্যা করে) নিয়মগুলো পরস্পরের সাথে মিলতে চায় না। কিন্তু এই উচ্চ শক্তি ঘনত্বের সীমায় গিয়ে মহাকর্ষ নিজেই কোয়ান্টাম কণার মতো আচরণ করতে শুরু করে। এখানেই এই দুই তাত্ত্বিক জগতের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে।
যখন কোনো অতিক্ষুদ্র অঞ্চলে প্ল্যাঙ্ক শক্তির সমান শক্তি ঘনত্ব তৈরি হয়, তখন স্থান-কালের রূপ ঠিক কী দাঁড়ায়, তা নিয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের দুটি ভিন্নধর্মী ব্যাখা রয়েছে:
১) মাইক্রো ব্ল্যাক হোল গঠন: সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী, এত বিশাল প্ল্যাংক শক্তি অতিক্ষুদ্র জায়গায় (প্ল্যাংক দৈর্ঘ্য) জমা হলে মুহূর্তের মধ্যে একটি মাইক্রো ব্ল্যাক হোল তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু কোয়ান্টাম প্রভাবের কারণে এটি স্থায়ী হয় না, চোখের পলকে (প্ল্যাঙ্ক সময়ে) হকিং বিকিরণের মাধ্যমে বাষ্পীভূত হয়ে শক্তিতে পরিণত হয়।
২) কোয়ান্টাম ফোম (Quantum Foam): অন্যদিকে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি তত্ত্ব অনুযায়ী, এত বিশাল প্ল্যাংক শক্তি অতিক্ষুদ্র জায়গায় (প্ল্যাংক দৈর্ঘ্য) জমা হলে, এই চরম অস্থিরতায় স্থান-কালের মসৃণ চাদরটি সাবানের ফেনা বা বুদ্বুদের মতো উত্তাল রূপ ধারণ করে। অবিরাম শক্তি ও কণার সৃষ্টি এবং ধ্বংসের এই বিশৃঙ্খল অবস্থাকে বলা হয় কোয়ান্টাম ফোম।
এবার প্রশ্ন হলো কোয়ান্টাম ফোমের এই অস্থিরতায় স্থান কালের চাদরে কি ছিদ্র হবে? উত্তর হলো হ্যা।
কোয়ান্টাম ফোমের এই চরম অস্থিরতায় স্থান-কালের চাদরে অতি ক্ষুদ্র ফাটল বা সংক্ষিপ্ত পথ তৈরি হতে পারে। কোয়ান্টাম ফোমের এই বুদ্বুদগুলো থেকে মুহূর্তের জন্য তৈরি হতে পারে অতিক্ষুদ্র ওয়ার্মহোল (Wormhole)। তবে এগুলো এতই ক্ষণস্থায়ী যে এদের আয়ুষ্কাল মাত্র ১ প্ল্যাঙ্ক টাইম (প্রায় 10^{-43} seconds)। ফলে কোনো তথ্য বা কণা এর ভেতর দিয়ে যাওয়ার আগেই এগুলো বিলীন হয়ে যায়।
প্রশ্ন হলো এই ওয়ার্মহোল কি অন্য মহাবিশ্বের প্রবেশদ্বার? যদি মাল্টিভার্স বা বহু-মহাবিশ্বের অস্তিত্ব সত্যি হয়, তবে স্থান-কালের এই অণুবীক্ষণিক ফাটলগুলো তাত্ত্বিকভাবে অন্যান্য মহাবিশ্ব বা উচ্চ মাত্রায় (Dimensions) পৌঁছানোর প্রবেশদ্বারের গাণিতিক সম্ভাবনা নির্দেশ করে, যদিও বাস্তবে তা অতিক্রান্ত করা অসম্ভব।
আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম ফিজিক্স মিলিয়ে এই ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে চমৎকার হলেও বাস্তব পরীক্ষায় এটি প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন।
এর কারন আমাদের প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা। গবেষণাগারে 10^28eV প্ল্যাঙ্ক শক্তির সমান 'শক্তি ঘনত্ব' তৈরি করা আমাদের বর্তমান বা নিকট ভবিষ্যতের প্রযুক্তির পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।
যদিও মহাকাশ থেকে আসা কিছু আলট্রা-হাই-এনার্জি কসমিক রশ্মিতে প্রচুর শক্তি থাকে (প্রায় 10^20 eV পর্যন্ত)। কিন্তু এই শক্তি একটি একক কণার মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যের মতো অতিক্ষুদ্র আয়তনে সংকুচিত বা ঘঘনীভূত হয় না। ফলে কসমিক রশ্মিও স্থান-কালের চাদর ভাঙতে পারে না।
পরিশেষে বলা যায়, স্থান-কালের শেষ সীমা বা প্ল্যাঙ্ক শক্তি শুধু কোনো গাণিতিক সংখ্যা নয়, এটি আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞানের সীমানা। এটি এমন এক বিন্দু, যেখানে সময়, স্থান এবং মহাকর্ষের প্রচলিত সব নিয়ম বদলে যায়। এই চূড়ান্ত সীমা বুঝতে পারলেই হয়তো একদিন মানুষ জানতে পারবে - আমাদের এই মহাবিশ্ব মূল ভিত্তিস্তর আসলে কী দিয়ে তৈরি!
*** এই বিষয়ে অধিকতর জানতে তথ্যসূত্র হিসেবে কমেন্টে যুক্ত করে দেওয়া বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ড. লুইস জে. গ্যারে'র "Quantum evolution in spacetime foam" শীর্ষক মূল গবেষণাপত্রটি পড়ুন।
#DiscoverwithMainul #NASA #Spacetime #QuantumFoam #Multiverse #Physics #মহাকাশ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!