শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটি টিনের ঘরে থাকত রাকিব। সংসারে ছিল মা আর ছোট বোন। বাবা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন। অভাব ছিল তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
রাকিব ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখত—একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে, মাকে আর কষ্ট করতে দেবে না।
কিন্তু স্বপ্ন দেখা যত সহজ, বাস্তবতা ছিল তার চেয়েও কঠিন।
স্কুল শেষ করার পর অনেক জায়গায় চাকরির জন্য আবেদন করল রাকিব। একের পর এক পরীক্ষা দিল। কিন্তু কোথাও চাকরি হলো না।
প্রতিবার ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের সামনে হাসার চেষ্টা করত সে।
মা বুঝতে পারতেন ছেলের বুকের ভেতরের কষ্ট।
একদিন মা বললেন,
— “বাবা, হেরে যাওয়া আর থেমে যাওয়া এক কথা নয়। তুই শুধু থেমে যাস না।”
মায়ের কথাটা রাকিবের মনে গেঁথে গেল।
পরদিন থেকেই সে আবার শুরু করল।
সকালে একটি দোকানে কাজ করত, রাতে পড়াশোনা করত। ঘুমানোর সময় পেত মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টা। অনেক রাত ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে হয়েছে। অনেক দিন নিজের জন্য নতুন জামা না কিনে বোনের বই কিনে দিয়েছে।
একসময় একটি চাকরির পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ হলো।
কিন্তু সমস্যা শেষ হলো না।
চাকরির জন্য শহরের অন্য প্রান্তে যেতে হতো। প্রতিদিন বাসভাড়া জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ল। কয়েক দিন হেঁটেই অফিসে গেছে।
সহকর্মীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করত,
— “তুমি এত কষ্ট করেও হাল ছাড়ছ না কেন?”
রাকিব হেসে বলত,
— “কারণ আমার হেরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমার মা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।”
বছর কয়েক পর রাকিব সেই প্রতিষ্ঠানের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়ে উঠল।
প্রথম বেতন হাতে পাওয়ার দিন সে সোজা বাড়ি গেল। মায়ের হাতে পুরো টাকাটা দিয়ে বলল,
— “মা, আজ থেকে তোমাকে আর মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হবে না।”
মা কিছু বলতে পারলেন না। শুধু ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
রাকিবের চোখেও পানি চলে এলো।
সে জানত, আজকের এই সাফল্য শুধু তার নিজের নয়। এর পেছনে আছে মায়ের ত্যাগ, বোনের অপেক্ষা, অসংখ্য ব্যর্থতা আর না-হারা একটি মন।
সেদিন রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে রাকিব আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“জীবন আমাকে অনেকবার হারাতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি প্রতিবারই আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। তাই আজ আমি সফল নই শুধু—আমি একজন বিজয়ী।”
জীবনযুদ্ধে জয় মানে কখনো না হারা নয়।
জীবনযুদ্ধে জয় মানে—হেরে যাওয়ার পরও আবার উঠে দাঁড়ানো।
আর যে মানুষ চেষ্টা করা বন্ধ করে না, তার কাছে একদিন না একদিন অসম্ভবও হার মানে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!